পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার (বা সোমপুর মহাবিহার) ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বিখ্যাত প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র। এটি বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত। অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগ বা নবম শতাব্দীর শুরুতে পাল রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপাল দেব এটি নির্মাণ করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো একে 'বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান' (World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পাল শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির চরম উৎকর্ষের যুগে এই মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি নালন্দা বা তক্ষশীলার মতো সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিল। তিব্বতি সূত্র অনুসারে, বৌদ্ধ পন্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর এখানে দীর্ঘকাল অবস্থান করেছিলেন। প্রায় ৪৫০ বছর ধরে এটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় থাকার পর দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজবংশের উত্থান এবং পরবর্তীতে বৈদেশিক আক্রমণের ফলে এর গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে।
স্থাপত্যশৈলী ও গঠন
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের স্থাপত্য পরিকল্পনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (যেমন ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর বা মিয়ানমারের প্যাগান) স্থাপত্যশৈলীকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।
মূল মন্দির: বিহারের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মন্দিরটি দেখতে অনেকটা পাহাড়ের মতো উঁচু, যেখান থেকে 'পাহাড়পুর' নামের উৎপত্তি। এর গঠনশৈলী ক্রুশাকার (Cruciform)।ভিক্ষু কক্ষ: মূল মন্দিরের চারপাশে বর্গাকার প্রাঙ্গণ ঘিরে মোট ১৭৭টি কক্ষ রয়েছে। এই কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস এবং অধ্যয়ন করতেন।
আয়তন: সমগ্র বিহারটি ২৭ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত। এর উত্তর দিকে একটিমাত্র প্রধান প্রবেশপথ রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি
১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এই স্থানটি পরিদর্শন করেন এবং খননকাজের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরবর্তীতে ১৯২৩ সাল থেকে এখানে নিয়মিত খননকাজ শুরু হয়।
পোড়ামাটির ফলক (Terracotta): মন্দিরের দেয়ালে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক খচিত রয়েছে। এগুলোতে সমসাময়িক মানুষের জীবনযাত্রা, জীবজন্তু, এবং পৌরাণিক কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।ভাস্কর্য ও লিপি: খননকার্যের ফলে এখানে বেলে পাথরের বুদ্ধ মূর্তিসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি এবং মূল্যবান লিপি পাওয়া গেছে।
জাদুঘর: বিহার সংলগ্ন একটি জাদুঘরে খননকার্যের মাধ্যমে প্রাপ্ত মুদ্রা, সিলমোহর, মাটির পাত্র এবং অন্যান্য প্রত্নবস্তু প্রদর্শন করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ও বৈশ্বিক গুরুত্ব
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এটি প্রাচীন বাংলার উন্নত স্থাপত্যবিদ্যা ও শিক্ষার এক অনন্য নিদর্শন। এর নকশা ও পরিকল্পনার প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক বৌদ্ধ স্থাপত্যে পরিলক্ষিত হয়। এটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র এবং প্রাচীন বৌদ্ধ ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।