মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। মহাস্থানগড় মূলত প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের রাজধানী 'পুণ্ড্রনগর'-এর ধ্বংসাবশেষ। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি একটি সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল।
ঐতিহাসিক পটভূমি
মহাস্থানগড়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। এটি মৌর্য, গুপ্ত, পাল এবং সেন রাজবংশের শাসনকালসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের সাক্ষী।
পুণ্ড্রনগর: প্রাচীন শিলালিপি ও সাহিত্যিক তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির রাজধানী। সম্রাট অশোকের শাসনামলে এখানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন।
হিউয়েন সাঙের বর্ণনা: সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ পুণ্ড্রনগর ভ্রমণ করেন এবং তাঁর বর্ণনায় এখানকার বহু বৌদ্ধ বিহার ও মঠের কথা উল্লেখ করেন।
আবিষ্কার: ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক আলেকজান্ডার কানিংহাম এই বিশাল ধ্বংসাবশেষকে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর হিসেবে শনাক্ত করেন।
স্থাপত্য ও স্থাপনা
মহাস্থানগড় একটি সুরক্ষিত দুর্গ-নগরী ছিল। এর চারপাশ উঁচু মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, যা উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৫০০ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৩৭০ মিটার বিস্তৃত।
প্রধান উল্লেখযোগ্য নিদর্শনসমূহ:
বেহুলার বাসর ঘর (গোকুল মেধ): এটি মূলত একটি বিশাল বৌদ্ধ স্তূপ বা মঠের ভিত্তি। লোককাহিনী অনুসারে একে বেহুলা-লক্ষিন্দরের বাসর ঘর বলা হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে এটি একটি ধর্মীয় স্থাপনা।
গোবিন্দ ভিটা: দুর্গের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই স্থাপনাটি একটি প্রাচীন মন্দির কমপ্লেক্স।
শীলদেবীর ঘাট: করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত এই ঘাটটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
জিয়ত কুণ্ড: একটি প্রাচীন কূপ, যা নিয়ে বিভিন্ন অলৌকিক লোককাহিনী প্রচলিত রয়েছে।
মহাস্থানগড় জাদুঘর: এখানে খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত বিভিন্ন যুগের পোড়ামাটির ফলক (Terracotta), মুদ্রা, গয়না, পাথরের ভাস্কর্য এবং অন্যান্য মূল্যবান প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত রয়েছে।
ধর্মীয় গুরুত্ব
মহাস্থানগড় দীর্ঘকাল ধরে বৌদ্ধ, হিন্দু এবং মুসলিম—এই তিন ধর্মের মিলনস্থল হিসেবে বিবেচিত। এখানে শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ার (র.)-এর মাজার শরিফ অবস্থিত, যা মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এখানে জিয়ারত করতে আসেন।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও সংরক্ষণ
ইউনেস্কো মহাস্থানগড়কে বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় স্থান দিয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এবং প্রাচীন নগর-দুর্গ। খননকার্যের মাধ্যমে প্রাপ্ত এনবিপিডব্লিউ (Northern Black Polished Ware) এবং খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের ব্রাহ্মী শিলালিপি এই অঞ্চলের উন্নত নগরায়ণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রমাণ দেয়।