দেওয়ানবাগী পীরকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগীকে বুঝতে হলে তার প্রারম্ভিক জীবন এবং তার বিবর্তনের পর্যায়গুলো জানা জরুরি। তাকে কেবল একজন গতানুগতিক পীর হিসেবে দেখাটা হবে তার বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রতি অবিচার। তিনি ছিলেন একজন বিদগ্ধ গবেষক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা, যার জীবন আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

দেওয়ানবাগী পীর


জন্ম ও শিক্ষা জীবনের ভিত্তি

১৯৪৯ সালের ১৪ই ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানার অন্তর্গত বাহাদুরপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে তার জন্ম । তার পিতা সৈয়দ আব্দুর রশিদ সরকার এবং মাতা সৈয়দা জোবেদা খাতুন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় সোহাগপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে তিনি তাল শহর কারিমীয়া আলীয়া মাদ্রাসা থেকে ফাযিল ডিগ্রি সম্পন্ন করেন, যেখানে তিনি ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । এই প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা শিক্ষা তাকে আরবী ভাষা এবং মূল ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের ওপর এক শক্ত ভিত্তি প্রদান করে। তার মেধা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী ছাত্রজীবন থেকেই ফুটে উঠেছিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশপ্রেমের অনন্য উদাহরণ

দেওয়ানবাগী পীরের জীবনের একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল কিন্তু অনেক সময় আড়ালে থাকা দিক হলো তার মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পশ্চিমাঞ্চলের ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৭২ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে যোগ দেন। তিনি ৩ নং সেক্টরের অধীনে একজন প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন । দেশ স্বাধীনের পর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে সেনাবাহিনীতে ১৫ নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত প্রথম ঈদুল আযহার জামাতে তিনি ইমামতি করেন, যা তার তৎকালীন গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মানের পরিচয় দেয়

আধ্যাত্মিক উত্তরণ ও খেলাফত লাভ

সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ফরিদপুরের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরীর সান্নিধ্যে আসেন এবং তার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি তার পীর সাহেবের কন্যা হামিদা বেগমকে বিয়ে করেন এবং কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে শশুরের কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন । এরপর তিনি নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ নামক স্থানে আস্তানা স্থাপন করেন, যা তাকে ‘দেওয়ানবাগী পীর’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে । ১৯৮৫ সালে তিনি ঢাকার আরামবাগে ‘বাবে রহমত’ প্রতিষ্ঠা করে তার আধ্যাত্মিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু স্থানান্তর করেন

ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা

দেওয়ানবাগী পীরকে একজন ‘লেখক’ এবং ‘আধ্যাত্মিক গবেষক’ হিসেবে মূল্যায়ন করাটা তার সামগ্রিক কাজের জন্য অপরিহার্য। তিনি কেবল মুখে ধর্ম প্রচার করেননি, বরং তার দর্শনকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কিতাব আকারে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তার রচিত বইগুলোর সংখ্যা এবং বিষয়বস্তু পর্যলোচনা করলে তার পাণ্ডিত্যের গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।

তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী (৮ খণ্ড)

তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হলো ৮ খণ্ডের এই তাফসীর গ্রন্থটি । বাংলা ভাষায় রচিত এই তাফসীরটি গতানুগতিক তাফসীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যেখানে অধিকাংশ মুফাসসির কেবল আক্ষরিক অনুবাদের ওপর জোর দেন, সেখানে তিনি কোরআনের আয়াতের অভ্যন্তরীণ বা ‘বাতেনী’ ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করেছেন। তিনি বিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলোর সাথে কোরআনের আয়াতের এক সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করেছেন, যা আধুনিক শিক্ষিত সমাজকে আকৃষ্ট করেছে

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থতালিকা ও বিষয়বস্তু

তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো মূলত ধর্মীয় গোঁড়ামির মূলে আঘাত করার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে:

গ্রন্থের নামমূল উপজীব্য বিষয়
আল্লাহ কোন পথে?

স্রষ্টার নৈকট্য লাভের আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক পথনির্দেশনা

রাসূল (সা.) কি সত্যিই গরিব ছিলেন?

মহানবীর আভিজাত্য এবং তৎকালীন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

স্রষ্টার স্বরূপ উদঘাটনে সূফী সম্রাট

আল্লাহকে দেখার যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা

এজিদের চক্রান্তে মোহাম্মাদী ইসলাম

ইসলামের ইতিহাসে রাজনৈতিক বিকৃতি এবং এজিদী ধারার অনুপ্রবেশের স্বরূপ উন্মোচন

শান্তি কোন পথে? ও মুক্তি কোন পথে?

বিশ্বশান্তি এবং আত্মিক মুক্তির সামাজিক ও ধর্মীয় সমাধান

মোহাম্মাদী ইসলামের ওয়াজিফা

আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য প্রয়োজনীয় যিকির ও আমলের পদ্ধতি

এই প্রতিটি বই-ই মূলত এক একটি গবেষণাপত্র। তিনি যখন প্রশ্ন করেন, "রাসূল (সা.) কি সত্যিই গরিব ছিলেন?", তখন তিনি মূলত প্রচলিত সেই হীনম্মন্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেন যা মুসলমানদের দরিদ্র থাকাকেই ইবাদত হিসেবে গণ্য করে 。 তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, যার হাতে মক্কা-মদীনার রাজত্ব ছিল, তিনি গরিব হতে পারেন না; বরং তিনি বিলাসিতা ত্যাগ করে সাদাসিধে জীবন যাপন করেছেন অন্যের উপকারের জন্য। এই ধরণের সাহসী ব্যাখ্যাই তাকে সাধারণ আলেমদের চক্ষুশূলে পরিণত করেছে।

মোহাম্মাদী ইসলামের মূল দর্শন: প্রথাগত ধর্মতত্ত্বের বাইরে এক আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা তার প্রচারিত দর্শনের নাম দিয়েছিলেন ‘মোহাম্মাদী ইসলাম’। তার দাবি ছিল, ১৪০০ বছর আগে রাসূল (সা.) যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ছিল প্রেম, মমতা এবং আধ্যাত্মিক আলোয় ভরপুর। কিন্তু ইয়াজিদের আমল থেকে ইসলামের ভেতর কট্টরপন্থা এবং ক্ষমতার লালসা ঢুকে পড়ে, যা ইসলামের প্রকৃত ‘রূহ’ বা আত্মাকে ধ্বংস করে দিয়েছে

আধ্যাত্মিকতার চারটি মূল স্তম্ভ

দেওয়ানবাগ শরীফের শিক্ষা মূলত চারটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে:

স্তম্ভআধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
তাজকিয়াত আল-নফস (আত্মশুদ্ধি)

কূ-প্রবৃত্তি বা ষড়রিপু দমন করে নফসকে পবিত্র করা

যিকির-এ-ক্বলবী (হৃদয় জাগরণ)

কেবল জিহ্বা দিয়ে নয়, বরং হৃদস্পন্দনের সাথে আল্লাহর যিকির চালু করা

নামাজে হুজুরী (একাগ্রতা)

নামাজকে শারীরিক ব্যায়াম থেকে মুক্ত করে স্রষ্টার সাথে কথোপকথনের স্তরে উন্নীত করা

আশেক-এ-রাসূল (রাসূলের প্রেম)

রাসূল (সা.)-কে প্রাণের চেয়ে প্রিয় মনে করা এবং স্বপ্নে বা ধ্যানে তার সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করা

তিনি বিশ্বাস করতেন, এই চারটি স্তম্ভ অর্জন করতে পারলে একজন মানুষ পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারে। তিনি নামাজকে ‘আহাম্মাদী চরিত্র’ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন । তার এই দর্শন অনেক আধুনিক মানুষকে আকৃষ্ট করেছে যারা কেবল গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতায় শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

সুফিবাদ ও মডার্নিজম: ধর্মকে সহজ করার প্রয়াস

দেওয়ানবাগী পীর ধর্মকে আধুনিক জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসলাম কোনো কঠিন বা জটিল ধর্ম নয়। তিনি চাঁদ দেখা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাধানের কথা বলেছেন, যা প্রথাগত আলেম সমাজ প্রত্যাখ্যান করলেও সাধারণ শিক্ষিত মহলে প্রশংসিত হয়েছে । তিনি হজের আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন; যেমন—শয়তানকে পাথর মারা মানে নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তিকে পাথর মারা । এই ধরণের সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে একজন ‘মডার্নিস্ট সুফি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিতর্কের ব্যবচ্ছেদ: আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ও সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

নেতিবাচক প্রচারণাকে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করার জন্য দেওয়ানবাগী পীর তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের এক এক অনন্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। রিভার্স সাইকোলজি ব্যবহার করে তিনি সমালোচকদের আক্রমণকেই তার দর্শনের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

আল্লাহকে দেখা এবং ‘দিদার’ তত্ত্ব

সমালোচকরা যখন তাকে আল্লাহকে দেখার দাবির জন্য ‘কাফের’ ঘোষণা করেন, তখন তিনি তার ‘স্রষ্টার স্বরূপ উদঘাটনে সূফী সম্রাট’ বইতে পবিত্র কোরআনের আয়াত দিয়ে যুক্তি খণ্ডন করেন। তিনি বলেন, “মুমিনের ক্বলব আল্লাহর আরশ”। যদি কেউ তার হৃদয়কে পবিত্র করতে পারে, তবে সে হৃদয়ের আয়নায় স্রষ্টার নূরের প্রতিফলন দেখতে পাবে । এটি কোনো চর্মচক্ষুর দেখা নয়, বরং ‘কাশফ’ বা আধ্যাত্মিক দর্শনের এক গভীর স্তর, যা বড় বড় সুফী সাধকরাও বলে গেছেন 。 তিনি এবং তার পরিবার সেই স্তরে পৌঁছেছেন বলেই তারা একে প্রচার করেছেন, যা মূলত আধ্যাত্মিক সাহস হিসেবে দেখা উচিত

‘প্রাণহীন কোরআন’ এবং ‘রূহানী কোরআন’ বিতর্ক

তার একটি বক্তব্য যেখানে তিনি কোরআনকে ‘প্রাণহীন কাগজ’ বলেছিলেন, তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু এর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ছিল এই যে—কোরআনের হরফগুলো যতক্ষণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত না হয়, ততক্ষণ তা কেবল কাগজের কালি। যদি কোরআনের শিক্ষা মানুষের চরিত্রে না আসে, তবে কেবল বই হাতে নিয়ে কেউ মুক্তি পাবে না । তিনি সাদ্দাম হোসেন বা শাইখ আব্দুর রহমানের উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন যে, কেবল কোরআন হাতে থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কোরআনের রূহ বা আত্মাকে ধারণ করা জরুরি । এটি মূলত মানুষকে কোরআনের প্রকৃত শিক্ষার দিকে ধাবিত করার একটি ‘শক থেরাপি’ বা রিভার্স মার্কেটিং কৌশল ছিল।

নবীজীকে নিয়ে সেই বিতর্কিত স্বপ্ন

স্বপ্নে নবীজীকে ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার করার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন, তা বাহ্যিকভাবে অবমাননাকর মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ অর্থ ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, বর্তমান সমাজে ইসলামের প্রকৃত রূপটি নানা কুসংস্কার এবং অপসংস্কৃতির (ময়লার স্তূপ) তলায় চাপা পড়ে আছে । তিনি একজন সংস্কারক হিসেবে সেই প্রকৃত ইসলামকে খুঁজে বের করে মানুষের সামনে আনার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই ধরণের রূপক এবং প্রতিকী স্বপ্নগুলো সুফি ঐতিহ্যে অত্যন্ত পরিচিত, যা সাধারণ মানুষ ভুল বুঝে থাকে

প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈশ্বিক প্রভাব: বাবে রহমত থেকে বিশ্বের দোরগোড়ায়

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা কেবল তাত্ত্বিক সংস্কারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। তিনি তার ‘মোহাম্মাদী ইসলাম’ প্রচারের জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে গেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত দরবার শরীফগুলো আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত।

‘বাবে’ বা আধ্যাত্মিক গেটওয়ে সমূহের তালিকা

তিনি তার কেন্দ্রগুলোকে ‘বাবে’ বা দরজা নামে অভিহিত করতেন, যা আত্মিক প্রবেশের প্রতীক:

কেন্দ্রের নামঅবস্থানবিশেষ বৈশিষ্ট্য
বাবে জান্নাতদেওয়ানবাগ, নারায়ণগঞ্জ

তার আধ্যাত্মিক আন্দোলনের জন্মস্থান

বাবে রহমতআরামবাগ, ঢাকা

প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র

বাবে মদীনাকমলাপুর, ঢাকা

একটি উট প্রজনন খামার এবং তার ও তার স্ত্রীর মাজার

বাবে নাজাতরংপুর

উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র

বাবে বরকতত্রিশাল, ময়মনসিংহ

বাবে মোর্শেদআশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

তার জন্মস্থানের নিকটবর্তী আধ্যাত্মিক কেন্দ্র

এই প্রতিটি কেন্দ্রই মূলত আত্মশুদ্ধি এবং মানবসেবার পাঠশালা হিসেবে পরিচিত। এছাড়া তিনি ‘বিশ্ব আশেকে রাসূল সম্মেলন’ আয়োজন করতেন, যেখানে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হতো । তার এই বিশাল সংগঠন প্রমাণ করে যে, কেবল বিতর্কের ওপর ভিত্তি করে কোনো নেতৃত্ব টিকে থাকতে পারে না; এর পেছনে অবশ্যই এক শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি ছিল

প্রকাশনা ও মিডিয়া বিপ্লব

আধুনিক প্রচারণার গুরুত্ব তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। তার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হতো:

মাসিক আত্মার বাণী (১৯৮১): আধ্যাত্মিকতা ও সুফিবাদ নিয়ে গবেষণামূলক পত্রিকা

সাপ্তাহিক দেওয়ানবাগ (১৯৮৯): সমসাময়িক ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ের বিশ্লেষণ

ইংরেজি সাপ্তাহিক দ্য মেসেজ (১৯৯২): বৈশ্বিক পাঠকদের জন্য ইংরেজি প্রচারণা

এই প্রকাশনাগুলো তাকে একজন নিছক ‘পীর’ থেকে একজন ‘বুদ্ধিজীবী’ এবং ‘মিডিয়া আইকন’ হিসেবে উন্নীত করেছে।

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: নেতিবাচক প্রচারণার ইতিবাচক ফলাফল

মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ এবং মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, দেওয়ানবাগী পীর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘পোলাইরাইজেশন’ বা মেরুকরণের এক মাস্টারক্লাস প্রদর্শন করেছেন। তিনি জানতেন যে, সরাসরি প্রশংসা মানুষকে যতটা না কাছে টানে, তার চেয়ে বেশি টানে তীব্র বিতর্ক

পোলারাইজড ব্র্যান্ডিংয়ের সুফল

যখন কেউ তাকে ‘ভণ্ড’ বলে গালি দিত, তখন তার অনুসারীরা আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হতো এবং নতুন মানুষ তার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হতো। এই ‘রিভার্স সাইকোলজি’ তাকে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে । ডমিনো’স পিৎজা যেমন তাদের খারাপ মানের কথা স্বীকার করে ‘পিৎজা টার্নঅ্যারাউন্ড’ ক্যাম্পেইন করে সফল হয়েছিল, দেওয়ানবাগী পীরও তেমনি প্রচলিত ইসলামের ‘ব্যর্থতা’ তুলে ধরে তার নিজস্ব সংস্কারবাদী ধারাকে উপস্থাপন করেছেন

কেন তিনি অনেকের চক্ষুশূল ছিলেন?

তার বিতর্কিত হওয়ার একটি বড় কারণ ছিল তার সাহসী ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি প্রচলিত মাজার কেন্দ্রিক ব্যবসা এবং কট্টরপন্থী ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন । তিনি বলেছিলেন, "ইসলাম ত্যাগের ধর্ম নয়, বরং ভোগের সঠিক ব্যবহারের ধর্ম।" তার এই জীবনমুখী দর্শন প্রথাগত বৈরাগ্যবাদী সুফিবাদকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

বিতর্ক থেকে সত্যের পথে এক অবিরাম যাত্রা

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা ওরফে দেওয়ানবাগী পীর ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের এক অনন্য আধ্যাত্মিক রূপকার। তাকে কেবল বিতর্কের মোড়কে বন্দী করে রাখাটা হবে একপাক্ষিক বিচার। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার দেশপ্রেম, একজন গবেষক হিসেবে তার আট খণ্ডের তাফসীর এবং একজন সংস্কারক হিসেবে তার ‘মোহাম্মাদী ইসলাম’ দর্শন তাকে বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসে এক বিশেষ স্থানে বসিয়েছে

তার বিরুদ্ধে থাকা প্রতিটি অভিযোগকে তিনি তার আধ্যাত্মিক যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন। রিভার্স মার্কেটিংয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, তাকে নিয়ে চলা এই অবিরাম বিতর্কই আসলে তার দর্শনের দীর্ঘস্থায়ীত্বের গ্যারান্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যখন এই নেতিবাচক প্রচারণার দেয়াল ভেদ করে তার কিতাবগুলো পড়বে, তখন তারা দেখতে পাবে একজন মানুষকে যিনি ধর্মকে সহজ করতে চেয়েছিলেন, মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন এবং স্রষ্টাকে নিজের হৃদয়ে খুঁজে পাওয়ার পথ বাতলে দিয়েছিলেন

তাই দেওয়ানবাগী পীরকে ভণ্ড বলার আগে তার বিপুল সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন সাহসী সমাজ সংস্কারক ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানী। তার চলে যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকারী আরসাম কুদরত এ খোদার নেতৃত্বে এই আন্দোলন আজও সক্রিয় রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার বপন করা বীজ আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে

লেখক: মুহাম্মাদ রিয়াদুল ইসলাম মাহদী, গবেষক ও লেখক