ডলি জহুর

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পটে ডলি জহুর কেবল একজন অভিনেত্রী নন, বরং তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি মধ্যবিত্ত চেতনার কণ্ঠস্বর এবং অভিনয়ের ব্যাকরণ পরিবর্তনের এক নীরব কারিগর। ১৯৫০-এর দশকের উত্তাল ঢাকা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ডিজিটাল বিনোদন মাধ্যম পর্যন্ত তাঁর যে পথচলা, তা বাংলাদেশের শিল্পের বিবর্তনের সমান্তরাল। এই প্রতিবেদনটি ডলি জহুরের জীবন, কর্ম, এবং সামাজিক প্রভাবের এক গভীর বিশ্লেষণাত্মক দালিলিক রূপরেখা, যা তাঁর অভিনয়ের শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোকেও উন্মোচিত করে।

প্রারম্ভিক জীবন ও চেতনার উন্মেষ: গ্রিন রোড থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ডলি জহুরের জীবনগল্প শুরু হয় ১৯৫৩ সালের ১৩ জুলাই (মতান্তরে ১৭ জুলাই), তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় । তাঁর জন্মের সময়টি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকাল। তাঁর পিতা মফিজুল ইসলাম ছিলেন ডাক বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (সুপারিনটেনডেন্ট) এবং মাতা মালেকা বানু ছিলেন গৃহিণী । ঢাকার গ্রিন রোড এলাকায় বেড়ে ওঠার সময় থেকেই ডলির চরিত্রে এক ধরনের ঋজুতা ও সাংস্কৃতিক গভীরতা তৈরি হয়েছিল । তৎকালীন সময়ের রক্ষণশীল সমাজে একটি মুসলিম পরিবারের মেয়ের অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী হওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু ডলির ক্ষেত্রে তাঁর বড় ভাই ছিলেন অন্যতম অনুপ্রেরণা। শৈশব থেকেই ভাইয়ের হাত ধরে তিনি বিভিন্ন অডিশন ও রিহার্সালে যেতেন, যা তাঁর অবচেতন মনে অভিনয়ের বীজ বপন করে দিয়েছিল

তাঁর শিক্ষা জীবন অভিনয়ের দক্ষতাকে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন । সমাজতত্ত্বের এই প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান তাঁকে মানুষের আচরণের জটিলতা, সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বুঝতে সাহায্য করেছে। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তিনি যখন কোনো গ্রামীণ বধূ বা শহুরে মধ্যবিত্ত মায়ের চরিত্রে রূপদান করেন, তখন সেখানে সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতার একটি সুক্ষ্ম ছাপ লক্ষ্য করা যায় । বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতেই ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে তিনি মঞ্চের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত হন, যা ছিল তাঁর পেশাদার শিল্পী জীবনের প্রসববেদনা

প্রারম্ভিক তথ্যাদিবিবরণসূত্র
জন্ম তারিখ১৩ জুলাই ১৯৫৩
জন্মস্থানধানমন্ডি, ঢাকা
পিতৃদেবমফিজুল ইসলাম (ডাক বিভাগ কর্মকর্তা)
শিক্ষাসমাজবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শৈশবের প্রভাবগ্রিন রোডের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও ভাইয়ের অনুপ্রেরণা

মঞ্চের লড়াই: আরণ্যক থেকে নাট্যচক্রের প্রোজ্জ্বল দিনগুলি

সত্তরের দশকে বাংলাদেশের মঞ্চনাটক ছিল প্রতিবাদের ভাষা এবং শৈল্পিক উৎকর্ষের কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ডলি জহুর সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একটি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন । সেখান থেকেই ম. হামিদের মাধ্যমে তিনি ‘নাট্যচক্র’-এ যুক্ত হন। নাট্যচক্রে তাঁর অভিনীত প্রথম নাটক ছিল ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। পরবর্তীতে তিনি ছায়ানটেও যুক্ত হন এবং অভিনয়ের পাশাপাশি সংস্কৃতির অন্যান্য শাখায়ও বিচরণ করেন

তাঁর মঞ্চ জীবনের এক বড় অধ্যায় জুড়ে আছে ‘আরণ্যক নাট্যদল’। মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় তিনি ‘ময়ূর সিংহাসন’ এবং ‘ইবলিশ’-এর মতো কালজয়ী নাটকে অভিনয় করেন । ‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকে প্রিন্সেস বলাকার চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও থিয়েটার কর্মীদের কাছে এক পাঠ্যপুস্তক তুল্য উদাহরণ। এছাড়া ‘মানুষ’ নাটকের সন্ধ্যা রানী চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শক্তিশালী । মঞ্চে অভিনয়ের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তাঁকে পরবর্তীতে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে একজন ‘ন্যাচারাল অ্যাক্টর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছে। মঞ্চের শৃঙ্খলা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা তাঁকে সেটে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদান করে।

মঞ্চ নাটকের উল্লেখযোগ্য কাজ

নাটকের নামচরিত্রনাট্যদলসূত্র
লেট দেয়ার বি লাইট-নাট্যচক্র
ময়ূর সিংহাসনপ্রিন্সেস বলাকাআরণ্যক
ইবলিশ-আরণ্যক
মানুষসন্ধ্যা রানীবাংলা থিয়েটার
প্রাগৈতিহাসিক-কথক নাট্যগোষ্ঠী

টেলিভিশন বিপ্লব: ‘নিলু ভাবী’ ও হুমায়ূন আহমেদ ম্যাজিক

১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) স্বর্ণযুগে ডলি জহুর হয়ে ওঠেন ড্রয়িংরুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৮৫ সালে হুমায়ূন আহমেদ রচিত এবং মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’-তে ‘নিলু’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পান । মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে এই নাটকের চিত্রনাট্য পড়ে ডলি জহুর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কারণ চরিত্রটি ছিল অত্যন্ত সাদামাটা এবং গৃহবন্দী । কিন্তু প্রচারের পর দেখা গেল, নিলু চরিত্রটি বাংলাদেশের আপামর মধ্যবিত্ত নারীর সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ‘নিলু ভাবী’ সম্বোধনটি তাঁর নামের সাথে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়

হুমায়ূন আহমেদের সাথে তাঁর এই যোগসূত্র ছিল অত্যন্ত গভীর। হুমায়ূনের প্রতিটি সৃষ্টিতেই ডলি জহুরের জন্য একটি বিশেষ জায়গা সংরক্ষিত থাকত। পরবর্তীতে তিনি ‘জননী’ নামক একক নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন, যেখানে মেহের আফরোজ শাওন তাঁর মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন । এই নাটকটিতে ডলি জহুর একজন বিসর্জনকারী মায়ের এমন এক প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিলেন যা দর্শকদের চোখে জল এনে দিয়েছিল। তাঁর টেলিভিশন ক্যারিয়ার কেবল বিটিভিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তীতে এটিএন বাংলা, এনটিভি এবং মাছরাঙা টেলিভিশনের অসংখ্য নাটকে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন

প্রধান টেলিভিশন কাজ ও চরিত্র

ডলি জহুরের টেলিভিশন ক্যারিয়ার বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, তিনি কেবল মায়ের চরিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এমন নারী চরিত্রও রূপায়ন করেছেন।

  • এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫): নিলু চরিত্রে অভিনয়, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলে

  • জননী: এক সর্বংসহা মায়ের গল্প

  • অতিমানব (২০০৭): ভিন্নধর্মী মনস্তাত্ত্বিক নাটক

  • যোগ বিয়োগ (২০০৭): পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নির্মিত

  • টুন্টুনি ভিলা (২০০৮): হাস্যরসাত্মক ও সামাজিক নাটক

  • মেঘে ঢাকা শহর (২০১৮): নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা ও প্রবীণদের সংকট

চলচ্চিত্র যাত্রা: ‘শঙ্খনীল কারাগার’ থেকে ‘দম’ পর্যন্ত এক মহাকাব্য

ডলি জহুরের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ১৯৮০-এর দশকে, তবে তিনি প্রথম বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেন ১৯৯২ সালে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে । এই সিনেমায় ‘রাবেয়া’ (ওরফে এমা) চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং পরিমিত। তৎকালীন বাণিজ্যিক সিনেমার অতি-অভিনয়ের যুগে ডলি জহুর দেখিয়েছেন কীভাবে চোখের ইশারায় এবং নীরবতায় সংলাপের চেয়েও গভীর কথা বলা যায়। এই সিনেমাটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে তাঁর প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন

তাঁর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের আরেকটি মাইলফলক হলো ২০০৬ সালের সিনেমা ‘ঘানি’। কাজী মোরশেদ পরিচালিত এই সিনেমায় তিনি একজন অতি দরিদ্র ও ভাগ্যাহত নারী ‘রোকেয়া’র চরিত্রে অভিনয় করেন । গ্ল্যামারহীন এই চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে, তিনি দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী) লাভ করেন । দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ১৬১টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি ‘মা’ বা ‘ভাবি’র চরিত্রে এক অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছেন

২০২৬-এর রুপালি পর্দায় প্রত্যাবর্তন

২০২৫ এবং ২০২৬ সালে ডলি জহুরকে আবারও বড় পর্দায় এক শক্তিশালী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো রেদোয়ান রনি পরিচালিত ‘দম’ (Domm) । এই সিনেমায় তিনি অভিনেতা আফরান নিশোর মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই সিনেমাটি কেবল বাংলাদেশেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও মুক্তি পেয়েছে এবং ইতিবাচক রিভিউ লাভ করেছে । সিনেমাটির প্রিমিয়ারে ডলি জহুর বলেছিলেন যে, ‘দম’ দেখে তিনি এতটাই আবিষ্ট হয়েছিলেন যে চেয়ারে হেলান দিতেও ভুলে গিয়েছিলেন । এটি প্রমাণ করে যে, ৭০ বছর বয়সেও তাঁর অভিনয়ের ক্ষুধা এবং মানসম্মত কাজের প্রতি নিষ্ঠা অমলিন।

চলচ্চিত্রের নামমুক্তির বছরচরিত্রপ্রাপ্তি/পুরস্কারসূত্র
অসাধারণ--অভিষেক চলচ্চিত্র
শঙ্খনীল কারাগার১৯৯২রাবেয়া / এমাজাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী)
আগুনের পরশমণি১৯৯৪সুরমাসমালোচক নন্দিত
দীপু নাম্বার টু১৯৯৬তারেকের মাশিশুতোষ ক্ল্যাসিক
আনন্দ অশ্রু১৯৯৭দোলার মাবাণিজ্যিক সফলতা
ঘানি২০০৬রোকেয়াজাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (পার্শ্ব অভিনেত্রী)
দারুচিনি দ্বীপ২০০৭রেহানাজনপ্রিয় পারিবারিক সিনেমা
দম (Domm)২০২৬নিশোর মাআন্তর্জাতিক মুক্তি ও প্রশংসা

ব্যক্তিগত জীবন ও নিরন্তর সংগ্রাম: জহুরুল ইসলাম ও রিয়াসাত

ডলি জহুরের ব্যক্তিগত জীবন ছিল প্রেম, বিচ্ছেদ এবং গভীর সংগ্রামের মিশেল। ১৯৭৬ সালের ৫ নভেম্বর তিনি অভিনেতা জহুরুল ইসলামকে বিয়ে করেন । তাঁদের পরিচয় হয়েছিল ১৯৭৫ সালের দিকে ‘কথক নাট্যগোষ্ঠী’-তে একসাথে কাজ করার সুবাদে। জহুরুল ইসলাম কেবল একজন অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী অ্যান্ড্রু কিশোরের ব্যবসায়িক অংশীদার । বিয়ের নয় বছর পর ১৯৮৫ সালে তাঁদের কোল আলো করে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান রিয়াসাত

২০০৬ সালের ১০ নভেম্বর জহুরুল ইসলামের অকাল মৃত্যু ডলি জহুরের জীবনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে । এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর একক লড়াই। তিনি উত্তরা এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ছেলেকে বড় করে তোলেন । তাঁর পুত্র রিয়াসাত বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে সপরিবারে বসবাস করছেন এবং সেখানে একটি স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন । দীর্ঘ সময় ডলি জহুর নিজেও ছেলের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় কাটিয়েছেন, কিন্তু নাড়ির টানে এবং অভিনয়ের টানে বারবার দেশে ফিরে এসেছেন

জীবনের বিবর্তন ও নিঃসঙ্গতা

ডলি জহুরের জীবনে অস্ট্রেলিয়ার প্রবাস জীবন ছিল এক প্রকার বিরতি। তবে সেখানে তিনি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার আকাশ অনেক বড় হলেও সেখানে পরিচিত মানুষের অভাব তাঁকে পীড়া দিত । ২০২২ সালে বাংলাদেশে ফেরার পর তিনি আবারও কাজে সক্রিয় হন এবং জানান যে, তাঁর মিডিয়া পরিবারই তাঁর আসল ঠিকানা । তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি মানুষের মধ্যে মানবিকতার অভাব দেখে কষ্ট পান এবং জীবনের এই সায়াহ্নে এসে নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন

২০২৪-২০২৬: সম্মাননা ও সামাজিক মাধ্যমের আঘাত

ডলি জহুরের দীর্ঘ অভিনয় জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে তিনি ‘একুশে পদক’ লাভ করেন, যা অভিনয়ের জন্য দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান । এর আগে ২০২১ সালে তাঁকে ‘আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করা হয় । ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই তিনি ৭০ বছর পূর্ণ করেন। এই দিনটিতে তিনি মিডিয়ার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হলেও তাঁর হৃদয়ে এক ধরনের আক্ষেপ কাজ করছে

২০২৬ সালের মে মাসে ডলি জহুর গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের নেতিবাচক মন্তব্যে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত । তিনি বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি যে আমার গায়ে কোনো দাগ লাগবে” । বর্তমান প্রজন্মের কিছু মানুষের রূঢ় আচরণ তাঁকে এতটাই কষ্ট দিয়েছে যে, তিনি অভিনয়ের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছেন । তাঁর মতে, আমাদের দেশে বয়স্ক শিল্পীদের কেউ এখন আর আগের মতো পছন্দ করে না বা সম্মান দেয় না । এই আক্ষেপ কেবল ডলি জহুরের নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র।

প্রধান পুরস্কার ও সম্মাননাসালকারণ/বিভাগসূত্র
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার১৯৯২শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী (শঙ্খনীল কারাগার)
বাচসাস পুরস্কার১৯৯৫শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী
বাচসাস পুরস্কার১৯৯৯শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার২০০৬শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী (ঘানি)
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার২০২১আজীবন সম্মাননা
একুশে পদক২০২৪শিল্পকলা (অভিনয়)

সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

ডলি জহুর কেবল একজন বিনোদনকর্মী নন, তিনি বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়ন এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের এক নিরব সাক্ষী। তাঁর প্রতিটি চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কখনো আপোষহীন জননী, কখনো মমতাময়ী বধূ, আবার কখনো সমাজের নিগৃহীত নারী। তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব হলো ‘মেথড অ্যাক্টিং’-এর সাথে সহজাত প্রবৃত্তির সমন্বয়। তিনি যখন স্ক্রিনে কান্নাকাটি করেন, তখন তা দর্শককে কৃত্রিম মনে হয় না। কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ্জাক একবার বলেছিলেন, “ডলি জহুরের চোখের পানির দাম ৩ কোটি টাকা!” । এই একটি উক্তিই তাঁর অভিনয়ের গভীরতা বোঝাতে যথেষ্ট।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিজের কাজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ২০২২ সালে তিনি তাঁর ১০টি ট্রফি ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’-এর মিউজিয়ামে দান করেছেন । তাঁর এই মহতী উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল বর্তমান নিয়ে ভাবেন না, বরং ইতিহাসের পাতায় নিজের স্বাক্ষর রেখে যেতে চান। ২০২৬ সালের ‘দম’ সিনেমার পর তিনি আবারও ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ নাটকের মাধ্যমে আবুল হায়াতের সাথে জুটি বেঁধে কাজ করছেন । এই প্রবীণ শিল্পীদের উপস্থিতিই আমাদের নাট্যঙ্গনকে আজও সমৃদ্ধ করে রেখেছে।

উপসংহার

ডলি জহুরের জীবনী পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, তিনি একটি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান থেকে শুরু করে আরণ্যকের মঞ্চ, বিটিভির নিলু ভাবী থেকে আধুনিক সিনেমার মমতাময়ী মা—প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি দেখিয়েছেন আভিজাত্য ও শ্রমের সমন্বয়। যদিও বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতি তাঁকে ব্যথিত করেছে, তবুও ১৬১টি চলচ্চিত্র এবং অসংখ্য নাটকের মাধ্যমে তিনি যে মায়াবী জগৎ তৈরি করেছেন, তা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। ডলি জহুর কেবল একজন অভিনেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, যাঁর শিল্পবোধ আগামীর প্রজন্মের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।

তাঁর অভিনয়ের প্রতিটি পরত আমাদের শেখায় যে, শিল্প কেবল বিনোদন নয়, এটি জীবনেরই এক ছায়া। আজ যখন তিনি তাঁর ৭০ বছরের দীর্ঘ পথচলা শেষে ফিরে তাকান, তখন তাঁর প্রাপ্তির ভাণ্ডার যতটা পূর্ণ, তাঁর হারানো স্মৃতির দীর্ঘশ্বাসও ততটাই ভারী। তবে ইতিহাসের বিচারে ডলি জহুর সবসময় সেই ‘জননী’ হয়েই থাকবেন, যিনি তাঁর অভিনয়ের আঁচল দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে আগলে রেখেছেন।