বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেওয়ানবাগ দরবার শরীফ একটি সুপরিচিত, প্রভাবশালী এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত বিতর্কিত নাম। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উদ্ভূত এই প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে 'মোহাম্মাদী ইসলাম'-এর প্রধান প্রচারকেন্দ্র হিসেবে দাবি করে এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা, যিনি ভক্তদের কাছে 'সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী' নামে পরিচিত, তার জীবন ও দর্শনের মধ্য দিয়ে এক বিশেষ ধারার আধ্যাত্মিকতা প্রচারের প্রয়াস চালান
![]() |
| বাবে রহমত দেওয়ানবাগ শরীফ |
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠাতার জীবনদর্শন
দেওয়ানবাগ দরবার শরীফের ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জীবনকাহিনি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১৯৪৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানাধীন বাহাদুরপুর গ্রামে এক অভিজাত সৈয়দ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন
মাহবুব-এ-খোদার বাল্যকাল কাটে ধর্মীয় শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। তিনি স্থানীয় সোহাগপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তালশহার কারিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল ডিগ্রি অর্জন করেন
মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক জীবনের প্রভাব
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তরুণ মাহবুব-এ-খোদা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সরাসরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে তিনি তার ৭২ জন অনুসারী স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে মুক্তি সংগ্রামে যোগ দেন এবং ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে একজন প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে. এম. শফিউল্লাহর বিশেষ অনুরোধে তিনি নবগঠিত ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ধর্মীয় শিক্ষক (Religious Teacher) হিসেবে যোগদান করেন
আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও চন্দ্রপাড়া দরবার
সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জীবনে আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ফরিদপুরের চন্দ্রপাড়া দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আসার পর
চন্দ্রপাড়া দরবারে থাকাকালীন মাহবুব-এ-খোদা ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করেন। ১৯৮০ সালে তিনি সেখানে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৮২ সালে একটি উচ্চ বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও ডাকঘর স্থাপন করেন
দেওয়ানবাগ শরীফের প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার
১৯৮৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর (১০ মহররম, ১৪০৬ হিজরী) নারায়ণগঞ্জের মদনপুর ইউনিয়নের দেওয়ানবাগ নামক স্থানে তিনি 'বাবে জান্নাত দেওয়ানবাগ শরীফ' প্রতিষ্ঠা করেন
প্রধান কার্যালয় ও প্রশাসনিক কাঠামো
১৯৯২ সালে ঢাকার মতিঝিলের আরামবাগে ১৪৭ নম্বর বাড়িতে দরবার শরীফের স্থায়ী কার্যালয় 'বাবে রহমত' স্থাপিত হয়
এই বিশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেওয়ানবাগ শরীফ দেশের প্রতিটি প্রান্তে তাদের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। তাদের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের ১১টি প্রধান দরবার শরীফ এবং এক হাজারেরও বেশি খানকাহ রয়েছে
মোহাম্মাদী ইসলাম: মূল দর্শন ও আদর্শিক স্তম্ভ
দেওয়ানবাগ শরীফের প্রচারণার মূল ভিত্তি হলো 'মোহাম্মাদী ইসলাম'। সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দাবি করতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর গত চৌদ্দশ বছরে ইসলামে অনেক বিকৃতি প্রবেশ করেছে এবং তিনি সেই বিকৃতি সংশোধন করে প্রকৃত ও মূল ইসলাম পুনরুজ্জীবিত করছেন
১. তাজকিয়াতুন নফ্স (আত্মশুদ্ধি)
দেওয়ানবাগী হুজুরের মতে, মানুষের কলবে বা অন্তরে ছয়টি রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) আধ্যাত্মিক অন্ধকার তৈরি করে। এই অন্ধকার দূর করে চরিত্রকে পবিত্র ও সুশোভিত করাই হলো তাজকিয়াতুন নফ্স
২. জিকিরে কলবী (হৃদস্পন্দনের স্মরণে জাগরণ)
কেবল মুখে 'আল্লাহ' নাম উচ্চারণ করার পরিবর্তে হৃদয়ের স্পন্দনের সাথে আল্লাহর জিকিরকে একীভূত করাকে তারা জিকিরে কলবী বলে
৩. নামাজে হুজুরী (পূর্ণ নিবিষ্ট প্রার্থনা)
দেওয়ানবাগ শরীফের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো 'নামাজে হুজুরী'। তাদের দর্শন অনুযায়ী, দুনিয়াবী চিন্তা নিয়ে নামাজ পড়লে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না
৪. আশেকে রাসূল (সা.) হওয়া
মহানবী (সা.)-এর প্রতি অগাধ ও শর্তহীন ভালোবাসা পোষণ করাকে তারা ঈমানের মূল দাবি মনে করে
সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম
দেওয়ানবাগ দরবার শরীফ কেবল একটি ধর্মীয় আস্তানা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি একটি বৃহৎ সামাজিক সেবা সংস্থা হিসেবেও কাজ করে। সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা বিশ্বাস করতেন যে, আর্তমানবতার সেবা ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব নয়
শিক্ষা বিস্তার ও স্বাস্থ্য সেবা
দরবার শরীফের পক্ষ থেকে ঢাকার আরামবাগ হাই স্কুল ও কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাহাদুরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেওয়ানবাগ দরবার শরীফের ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় তারা মতিঝিল ও আরামবাগ এলাকায় হাজার হাজার বন্যার্ত মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খুলে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার পরিবেশন করতেন
গণমাধ্যম ও প্রকাশনা কার্যক্রম
দেওয়ানবাগ শরীফ তাদের মতাদর্শ প্রচারের জন্য একটি শক্তিশালী মিডিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তাদের প্রধান প্রকাশনাগুলো হলো:
মাসিক আত্মার বাণী (১৯৮১): এটি দরবারের সবচেয়ে পুরাতন প্রকাশনা যা মূলত তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি নিয়ে কাজ করে
সাপ্তাহিক দেওয়ানবাগ (১৯৮৯): সমসাময়িক ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়াদি তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে
দৈনিক ইনসানিয়াত (১৯৯১): মানবিক মূল্যবোধ ও 'মোহাম্মাদী ইসলাম' প্রচারের লক্ষ্য নিয়ে এই দৈনিকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
সাপ্তাহিক দ্য মেসেজ (১৯৯২): ইংরেজি ভাষায় আন্তর্জাতিক পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হয়
এই প্রকাশনাগুলোর মাধ্যমে তারা কেবল তাদের ভক্তদের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করে না, বরং দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছেও তাদের দর্শন পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে।
আন্তর্জাতিক বিস্তার ও বৈশ্বিক কমিউনিটি
দেওয়ানবাগ দরবার শরীফ নিজেদের একটি আন্তর্জাতিক আধ্যাত্মিক সংস্থা হিসেবে দাবি করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৩২টি দেশে তাদের মুরিদ বা ভক্ত রয়েছে
সুইডেন, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, পর্তুগাল, হাঙ্গেরি এবং ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে তাদের সুসংগঠিত কমিউনিটি সেন্টার রয়েছে
বিতর্ক, সমালোচনা ও বাস্তবতা
দেওয়ানবাগ দরবার শরীফ বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান। তাদের কিছু বিশেষ বিশ্বাস এবং প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার কিছু উক্তি আলেম সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।
ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ও ওলামাদের অবস্থান
মূলধারার ইসলামী পণ্ডিতরা দেওয়ানবাগী পীরের বিরুদ্ধে 'কুফরী' ও 'শিরক'-এর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের মতে, দেওয়ানবাগী হুজুর ইসলামের এমন কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন যা কুরআন ও হাদীসের মূল শিক্ষার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক
আল্লাহর আকার: তিনি দাবি করতেন আল্লাহ নিরাকার নন, বরং আল্লাহর একটি নূরানী অবয়ব বা আকার আছে
। তিনি যুক্তি দিতেন যে, 'এক' একটি সংখ্যা এবং যা গণনা করা যায় তার একটি রূপ থাকতে বাধ্য । জিবরাঈল (আ.)-এর পরিচয়: তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি জিবরাঈল (আ.)-কে ফেরেশতা হিসেবে অস্বীকার করে তাকে আল্লাহর একটি স্বরূপ হিসেবে দাবি করেছিলেন
। জান্নাত-জাহান্নামের ব্যাখ্যা: জান্নাত ও জাহান্নামকে কেবল আত্মার প্রশান্তি ও যন্ত্রণার অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা, যা হাশরের ময়দান ও পরকালের প্রথাগত আকিদার পরিপন্থী বলে মনে করা হয়
। সাহরীর সময় ও আযান: তিনি প্রচার করতেন যে সূর্যোদয় পর্যন্ত সাহরী খাওয়া যায় এবং আযান কেবল নামাজের জন্য, খাবার বন্ধ করার সংকেত নয়
।
উত্তরাধিকার ও বর্তমান নেতৃত্ব
২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৭১ বছর বয়সে সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা মৃত্যুবরণ করেন
ড. আরসাম কুদরত এ খোদার দায়িত্ব গ্রহণ
প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা তার মৃত্যুর একদিন আগে, ২৭ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ খাদেমদের উপস্থিতিতে একটি ওসিয়তনামা বা উইল (Will) তৈরি করেন
ড. আরসাম কুদরত এ খোদা ১৯৮৫ সালের ১৬ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আয়ারল্যান্ড থেকে থিওলজি বা ধর্মতত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বর্তমানে ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষকতা করছেন
উপসংহার: সমাজতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা
দেওয়ানবাগ দরবার শরীফ বাংলাদেশের আধুনিক ধর্মীয় ইতিহাসের একটি জটিল পাঠ। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা সুফিবাদের চিরায়ত ধারাকে ব্যবহার করে একটি কর্পোরেট ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর বিশাল ভক্ত শ্রেণি এবং দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক এটি প্রমাণ করে যে, সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশের মানুষের কাছে তাদের আদর্শিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে
তবে, মূলধারার ওলামাদের সাথে তাদের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ এবং ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের কারণে তারা মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন। দেওয়ানবাগী হুজুরের প্রথাগত আকিদার বাইরের ব্যাখ্যাগুলো যেমন অনেকের কাছে নতুনত্ব এনেছে, তেমনি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে তা বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে
পরিশেষে, দেওয়ানবাগ শরীফের বাস্তবতা হলো এটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি। বাংলাদেশের ধর্মীয় বহুত্ববাদের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটির টিকে থাকা বা বিকাশ লাভ করা মূলত নির্ভর করবে তাদের বিতর্কিত বিশ্বাসগুলোর সংস্কার এবং মূলধারার সমাজ ও শরীয়তের সাথে তাদের সমন্বয় করার ক্ষমতার ওপর।
লেখক: মুহাম্মদ রিয়াদুল ইসলাম আল-মাহদী, গবেষক, প্রিজম রিসার্চ সেন্টার

0 Comments