হরিনাথ দে

 হরিনাথ দে (১৮৭৭ – ১৯১১) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি ভাষাবিদ, বহুভাষাবিদ এবং পণ্ডিত। তিনি তাঁর অসাধারণ মেধা এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের বহু ভাষা আয়ত্ত করার দক্ষতার জন্য প্রসাদ্ধি লাভ করেন। তাঁকে আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

১৮৭৭ সালের ১২ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের কলকাতার অরিটলায় হরিনাথ দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল উত্তর ২৪ পরগনার আড়িয়াদহে। তাঁর পিতা রায়বাহাদুর ভূতনাথ দে ছিলেন রায়পুরের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।

হরিনাথ দে-র শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিপূর্ণ। রায়পুর হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করার পর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে লাতিন ও ইংরেজিতে বিএ (BA) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯৬ সালে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ (MA) পাস করেন। পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ধ্রুপদী ভাষা (Classical Languages)-এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

ভাষাজ্ঞান ও পাণ্ডিত্য

হরিনাথ দে-র সবচেয়ে বড় পরিচিতি ছিল তাঁর বহুভাষাবিদ (Polyglot) হিসেবে। তিনি প্রায় ৩৪টি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • এশীয় ভাষা: সংস্কৃত, পালি, বাংলা, আরবি, ফারসি, তিব্বতি, হিন্দি, ওড়িয়া এবং তামিল।

  • ইউরোপীয় ভাষা: ইংরেজি, লাতিন, গ্রিক, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, স্পেনীয়, পর্তুগিজ এবং রুশ।

তিনি কেবল এই ভাষাগুলো জানতেনই না, বরং এগুলোর অনেকগুলোতেই তিনি অনর্গল কথা বলতে ও সাহিত্য রচনা করতে পারতেন।

কর্মজীবন

হরিনাথ দে-র কর্মজীবন ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

  • প্রেসিডেন্সি কলেজ: কেমব্রিজ থেকে ফেরার পর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন এই কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যাপক।

  • ন্যাশনাল লাইব্রেরি: ১৯০৭ সালে তিনি কলকাতার ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির (বর্তমান ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার বা National Library) প্রথম ভারতীয় লাইব্রেরিয়ান বা গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হন।

  • অনুবাদ: তিনি মেকলের 'লays of Ancient Rome', কালিদাসের 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম' এবং ঋগ্বেদের বেশ কিছু অংশ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।

অবদান ও স্বীকৃতি

তিনি ভাষাতত্ত্বের ওপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ ও অভিধান সম্পাদনা করেছিলেন। পালি ভাষা ও বৌদ্ধ শাস্ত্রের ওপর তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি 'এশীয়টিক সোসাইটি'র সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বহু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি উদ্ধার ও সম্পাদনায় ভূমিকা রাখেন।

মৃত্যু

১৯১১ সালের ৩০শে আগস্ট মাত্র ৩৪ বছর বয়সে এই অসামান্য প্রতিভাধর পণ্ডিত টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অকাল মৃত্যুতে তৎকালীন বিশ্বের বিদগ্ধ সমাজ এক বিশাল শূন্যতা অনুভব করে।