সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরী

সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ (১৯০৯–১৯৮৪), যিনি তার জন্মস্থানের নামানুসারে চন্দ্রপুরী বা চন্দ্রপুরী হুজুর নামে সমধিক পরিচিত, ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি সুফি সাধক, আধ্যাত্মিক নেতা এবং ইসলামি পণ্ডিত। তিনি ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায় অবস্থিত বিখ্যাত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র 'চন্দ্রপাড়া পাক দরবার শরীফ'-এর প্রতিষ্ঠাতা। বিংশ শতাব্দীতে বাংলায় সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রসারে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।


তিনি ১৯০৯ সালে ফরিদপুর জেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন সৈয়দ মুহাম্মদ কোরবান আলী খান এবং মাতা বেগম খাদিজা খাতুন। তার বংশীয় ধারা আরব থেকে আনাতোলিয়া (তুরস্ক) হয়ে চট্টগ্রাম ও পরবর্তীতে ফরিদপুরে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এবং আধ্যাত্মিক চিন্তায় মগ্ন ছিলেন।

তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ফরিদপুরের রাজাচর মাদরাসায়, যেখানে তিনি ৬ বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চাঁদপুরের ওসমানিয়া মাদরাসা, মতলব উত্তরের কামরাঙ্গা মাদরাসা এবং সবশেষে ঢাকার বিখ্যাত হাম্মাদিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকহ এবং ইসলামি দর্শনে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ আধ্যাত্মিক ধারায় নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া সিলসিলার অনুসারী ছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জের প্রখ্যাত সুফি সাধক খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরীর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। দীর্ঘকাল পীরের সান্নিধ্যে থেকে কঠোর সাধনা ও রিয়াজতের পর তিনি খেলাফত লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি 'সুলতানিয়া-মুজাদ্দেদিয়া' নামক একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক ধারা প্রবর্তন করেন।

তিনি ফরিদপুর জেলার সদরপুরে 'চন্দ্রপাড়া পাক দরবার শরীফ' প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক সাধনা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তার শিক্ষার মূল ভিত্তি ছিল 'তাজকিয়া-এ-নফস' (আত্মশুদ্ধি) এবং 'জিকির-এ-কালবি' (হৃদয়ের জিকির)। তিনি দেওয়ানবাগ শরীফের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগীর আধ্যাত্মিক গুরু (মুর্শিদ) ছিলেন।

আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও সুফিবাদ নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে:

  • নুরুল আসরার (১ম ও ২য় খণ্ড)

  • হাক্কুল ইয়াকিন

  • সুলতানিয়া খাবনামা

১৯৮৪ সালের ২৮ মার্চ তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সৈয়দ কামরুজ্জামান এবং পরবর্তীতে তার বংশধরগণ দরবার শরীফের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে চন্দ্রপাড়ায় বার্ষিক ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও অনুসারী সমবেত হন।

লেখক: মুহাম্মাদ রিয়াদুল ইসলাম মাহদী