পহেলা বৈশাখ: বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বিবর্তন, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মহাকাব্যিক বিশ্লেষণ

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ কেবল একটি দিনপঞ্জির প্রথম দিন নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, অর্থনৈতিক বিবর্তন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। ঐতিহাসিকভাবে পহেলা বৈশাখ একটি কৃষিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থার অনুষঙ্গ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও কালক্রমে তা একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই উৎসবের মূলে রয়েছে মুঘল সম্রাট আকবরের প্রশাসনিক প্রজ্ঞা, মধ্যযুগীয় বাংলার সামন্ততান্ত্রিক রীতিনীতি এবং বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে পূর্ব বাংলার বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অপ্রতিরোধ্য চেতনা। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে পহেলা বৈশাখ যখন ইউনেস্কো স্বীকৃত 'অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে মর্যাদাপ্রাপ্ত, তখন এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।



ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও বঙ্গাব্দের বিবর্তন

বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত থাকলেও সম্রাট আকবরের 'ফসলি সন' প্রবর্তনের তত্ত্বটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ । মুঘল আমলের গোড়ার দিকে কর আদায়ের ক্ষেত্রে হিজরি পঞ্জিকা অনুসরণ করা হতো। হিজরি পঞ্জিকা সম্পূর্ণভাবে চন্দ্রনির্ভর হওয়ার কারণে এটি প্রতি বছর সৌর বছরের তুলনায় প্রায় ১০-১১ দিন পিছিয়ে যেত। এর ফলে কৃষিপ্রধান বাংলায় ফসল কাটার সময়ের সাথে খাজনা আদায়ের সময়ের বিস্তর অসংগতি তৈরি হতো। কৃষকরা যখন ফসল ঘরে তুলতে পারতেন না, তখনই তাদের ওপর খাজনা পরিশোধের চাপ আসত, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করত । এই সংকট নিরসনে সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এক নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের আদেশ দেন, যা কার্যকর করা হয়েছিল তাঁর সিংহাসন আরোহণের বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে

এই পঞ্জিকা সংস্কারের মূল কারিগর ছিলেন জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি। তিনি প্রাচীন ভারতীয় সৌর পঞ্জিকা এবং হিজরি চন্দ্র পঞ্জিকার মধ্যে এক অদ্ভুত সমন্বয় সাধন করেন । আকবর এই সনের নামকরণ করেছিলেন 'ফসলি সন', যা পরে 'বঙ্গাব্দ' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে । তবে অনেক গবেষক মনে করেন, ৭ম শতকের রাজা শশাঙ্কও বাংলা সনের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যাকে পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাটরা প্রশাসনিক প্রয়োজনে পরিমার্জন করেন

মাস ও সনের নামকরণের ভাষাগত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানগত উৎস

বাংলা মাসের নামগুলো মূলত বিভিন্ন নক্ষত্রের নাম থেকে সংগৃহীত। এটি প্রমাণ করে যে বাংলা সন প্রবর্তনের পেছনে গভীর জ্যোতির্বিজ্ঞানগত পর্যবেক্ষণ কাজ করেছে। নিচে বাংলা মাসের নামকরণের ভিত্তি ও উৎস প্রদর্শিত হলো:

বাংলা মাসসংশ্লিষ্ট নক্ষত্রনামকরণের পটভূমি ও তাৎপর্য
বৈশাখবিশাখা

বিশাখা নক্ষত্র থেকে আগত, গ্রীষ্মের সূচনা নির্দেশক।

জ্যৈষ্ঠজ্যেষ্ঠাজ্যেষ্ঠা নক্ষত্র, তীব্র দাবদাহ ও ফল পাকানোর সময়।
আষাঢ়আষাঢ়াবর্ষার প্রারম্ভ, মেঘের ঘনঘটা।
শ্রাবণশ্রবণাশ্রবণা নক্ষত্র, নদ-নদীর পূর্ণতা প্রাপ্তির কাল।
ভাদ্রভাদ্রপদাশরৎ ঋতুর আগমনী বার্তা।
আশ্বিনঅশ্বিনীহিম ঋতুর পূর্বাভাস ও স্বচ্ছ আকাশের কাল।
কার্তিককৃত্তিকাহেমন্তের সূচনা ও নবান্নের প্রস্তুতি।
অগ্রহায়ণমৃগশিরা

পূর্বতন বছরের প্রথম মাস (অগ্রহায়ণ শব্দের অর্থ বছরের শুরু)।

পৌষপুষ্যাশীতের তীব্রতা ও পিঠা-পলির উৎসবের সময়।
মাঘমঘাশুষ্ক ঋতু ও কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতির প্রতিফলন।
ফাল্গুনফাল্গুনীবসন্তের আগমন ও প্রকৃতির রঙিন রূপ।
চৈত্রচিত্রাচিত্রা নক্ষত্র, বিদায়ী বছরের শেষ মাস।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে ব্যবহৃত 'সন' শব্দটি আরবি এবং 'সাল' শব্দটি ফারসি থেকে আগত, যা এই পঞ্জিকার ওপর মুসলিম ও পারস্য সংস্কৃতির প্রভাবকে সুস্পষ্ট করে

হালখাতা ও পুণ্যাহ: গ্রামীণ ও বাণিজ্যিক অর্থনীতির স্তম্ভ

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ বাংলায় যে দুটি অর্থনৈতিক প্রথা সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল তা হলো 'হালখাতা' ও 'পুণ্যাহ'। মুঘল আমলে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে কৃষকদের সকল বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতে হতো । এর পরের দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি ও বিনোদনের মাধ্যমে আপ্যায়ন করতেন, যাকে 'পুণ্যাহ' উৎসব বলা হতো । নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এই প্রথাটিকে একটি আনুষ্ঠানিক উৎসবে রূপ দেন

জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর পুণ্যাহ তার জৌলুশ হারালেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে 'হালখাতা' প্রথাটি আজও সগৌরবে টিকে রয়েছে । ফারসি শব্দ 'হাল' মানে 'নতুন', অর্থাৎ হালখাতা মানে নতুন বছরের নতুন হিসাবের বই । ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখের দিন তাদের পুরনো খাতা বন্ধ করে লাল মলাটের নতুন খাতা খোলেন এবং ক্রেতাদের বিনীতভাবে দাওয়াত দিয়ে মিষ্টিমুখ করান । এই প্রথাটি কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়, বরং এটি ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও ১৯১৭-১৯৩৮ সালের উদযাপন

পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আধুনিক বিবর্তনের ইতিহাসে ব্রিটিশ আমল একটি বিশেষ মাইলফলক। যদিও সাধারণ মানুষ কৃষি ও ব্যবসার প্রয়োজনে এই দিনটি পালন করতেন, তবে ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে বিশেষ হোম কীর্তন ও পূজার আয়োজন করা হয়েছিল । ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ আয়োজনের খবর পাওয়া যায় । তবে সেই সময়কার নববর্ষ উদযাপন ছিল মূলত ব্রিটিশ অনুগত অভিজাত শ্রেণি কিংবা ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ। সাধারণ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব হিসেবে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে আরও কয়েক দশক সময় লেগেছিল।

পাকিস্তান আমল: সাংস্কৃতিক স্বাধিকার ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত হানতে শুরু করে । ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে জিন্নাহর 'উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা' ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে সংঘাতের বীজ বপন হয়েছিল, তা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয় । ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজ বুঝতে পারেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সাংস্কৃতিক স্বাধিকার অর্জন অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক নতুন ধারার সূচনা হয় । ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২১ দফার ইশতেহারে পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়েছিল । নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় এবং যুক্তফ্রন্টের বিজয় প্রমাণ করে যে বাঙালি জাতি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রশ্নে আপসহীন

ছায়ানট ও রমনা বটমূলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং বাঙালির উৎসবগুলোকে 'ইসলাম বিরোধী' বা 'হিন্দুয়ানি' আখ্যা দিয়ে বাধাগ্রস্ত করতে থাকে, তখন এর প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে সাংস্কৃতিক সংগঠন 'ছায়ানট' রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে । এই আয়োজনটি ছিল পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বাঙালির একটি সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ চ্যালেঞ্জ । রমনা বটমূলের সেই প্রভাতি অনুষ্ঠান কেবল গানের আসর ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালির অধিকারবোধের এক অগ্নিগর্ভ সমাবেশ । এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পহেলা বৈশাখ একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয় এবং ১৯৬০-এর দশকের শেষে এটি দেশের প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ লাভ করে

মঙ্গল শোভাযাত্রা: শিল্পকলা ও অশুভ বিনাশের প্রতীকী লড়াই

পহেলা বৈশাখের আধুনিক অনুষঙ্গগুলোর মধ্যে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' সর্বাধিক আলোচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৮৯ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্যোগে এই শোভাযাত্রার যাত্রা শুরু হয় । তৎকালীন সামরিক শাসনের অন্ধকার থেকে জাতিকে মুক্ত করার এবং মঙ্গলের আবাহন করার লক্ষ্যেই এই প্রতীকী মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল । শুরুতে এর নাম ছিল 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা', যা পরে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' হিসেবে পরিচিতি পায়

মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ হলো বিশালকায় লোকজ মোটিফ, মুখোশ এবং পাপেট। বাঘ, হাতি, ময়ূর, পেঁচা এবং ট্যাপা পুতুলের মতো গ্রামীণ লোকশিল্পের উপাদানগুলোকে এখানে আধুনিক শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় । ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে 'মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যা একে বিশ্বজনীন মর্যদা এনে দেয় । তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর নামকরণ নিয়ে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং ২০২৫-২৬ সালের জন্য অনেক স্থানে একে পুনরায় 'আনন্দ শোভাযাত্রা' নামে ডাকার পরিকল্পনা করা হচ্ছে

পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিতর্ক

আধুনিক পহেলা বৈশাখের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পান্তা-ইলিশ বিবেচিত হলেও এর সাথে বাঙালির চিরায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে করেন সংস্কৃতি গবেষকরা । প্রকৃতপক্ষে গ্রামীণ বাংলায় বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী খাবার ছিল 'পাঁচন' বা 'গণ্ড', যা বিভিন্ন সবজি ও শস্যের সংমিশ্রণে তৈরি হতো । গবেষকদের মতে, ১৯৭২ সালের পর ঢাকার শহুরে শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত সমাজে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়, যা ছিল মূলত একটি শৌখিন বা কর্পোরেট কালচারের বহিঃপ্রকাশ

পরবর্তীকালে আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পহেলা বৈশাখ যখন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন রমনা বটমূলের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা পায় । বর্তমানে এটি একটি আধুনিক ঐতিহ্যে রূপ নিলেও ইলিশ মাছের আকাশচুম্বী দাম এবং এর কৃত্রিম আভিজাত্য নিয়ে অনেক মহলে সমালোচনা রয়েছে । অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, পান্তা-ইলিশের চেয়ে গ্রামীণ মেলা ও লোকজ উপাদানগুলোই ছিল নববর্ষের প্রকৃত প্রাণ

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নববর্ষ: বৈসাবি ও গড়িয়া পূজা

পহেলা বৈশাখ কেবল সমতলের বাঙালির উৎসব নয়, বরং পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর কাছেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ঢঙে নববর্ষ পালন করে, যা একত্রে 'বৈসাবি' নামে পরিচিত

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নববর্ষ উদযাপনের প্রধান উৎসব হলো 'বৈসু'। এটি তিন দিন ধরে পালিত হয়: 'হারি বৈসু', 'বৈসুমা' এবং 'বিসিকাতাল' । এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হলো 'গড়িয়া পূজা' এবং 'গড়িয়া নৃত্য' । গড়িয়া দেবতা হলেন সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের দেবতা। বাঁশ, ফুল এবং বিশেষ বস্ত্র দিয়ে মূর্তির কাঠামো তৈরি করে সাত দিন ধরে গ্রাম ঘুরে নাচ-গানের মাধ্যমে এই পূজা সম্পন্ন করা হয় । ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই বৈচিত্র্যময় আয়োজন প্রমাণ করে যে বাংলা নববর্ষ একটি অখণ্ড ভৌগোলিক সংস্কৃতির প্রতীক।

লোকসংগীত ও গ্রামীণ ক্রীড়া: বিলুপ্তির পথে আদি ঐতিহ্য

পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল গ্রাম বাংলার মাঠজুড়ে মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। এই মেলার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল হাডুডু (কাবাডি), লাঠি খেলা এবং বলি খেলা

খেলার নামবৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ববর্তমান অবস্থা
হাডুডু (কাবাডি)

বাংলাদেশের জাতীয় খেলা, শারীরিক শক্তি ও কৌশলের প্রদর্শন।

আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে গ্রামীণ পর্যায় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

লাঠি খেলা

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের লাঠিয়ালদের বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।

মহরম ও পূজাসহ বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রদর্শনী হিসেবে টিকে আছে।
বলি খেলা

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কুস্তি প্রতিযোগিতা, আব্দুল জব্বার কর্তৃক প্রবর্তিত।

লালদিঘী ময়দানের বৈশাখী মেলার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে আজও জনপ্রিয়।

একইভাবে মেলার রাতগুলো মুখরিত থাকতো গম্ভীরা, জারি গান ও আলকাপের সুরে । বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরা গানে 'নানা' ও 'নাতি'র সংলাপে সামাজিক নানা অসংগতি তুলে ধরা হয় । গম্ভীরা গান মূলত শিবের গাজন থেকে এলেও এটি এখন সম্পূর্ণ সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ বিনোদনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে

পঞ্জিকা সংস্কার ও দুই বাংলার বৈচিত্র্য

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের তারিখ নিয়ে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। বাংলাদেশে এটি ১৪ এপ্রিল পালিত হলেও পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত ১৫ এপ্রিল পালিত হয় । এই পার্থক্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হলো ১৯৫২ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার প্রস্তাবিত পঞ্জিকা সংস্কার। তিনি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে পঞ্জিকাটিকে অনেক বেশি নিখুঁত করেন এবং সৌর বছরের সাথে সংগতিপূর্ণ করেন

১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মেঘনাদ সাহার সংস্কারকৃত পঞ্জিকা গ্রহণ করে এবং ১৪ এপ্রিলকে নববর্ষের স্থায়ী তারিখ হিসেবে ঘোষণা করে । অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সনাতনপন্থীরা এই পরিবর্তন মেনে নেননি এবং তারা প্রাচীন পঞ্জিকা অনুসরণ করা অব্যাহত রেখেছেন । এই মতভেদের কারণেই দুই বাংলার ক্যালেন্ডারে একদিনের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

উপসংহার: একটি অখণ্ড সাংস্কৃতিক চেতনার সংশ্লেষ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির জন্য কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়, এটি একটি জাতির টিকে থাকার সংগ্রাম, আত্মপরিচয় রক্ষার গৌরব এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার চূড়ান্ত প্রতিফলন। মুঘল সম্রাটের রাজকীয় ফরমান থেকে শুরু করে ঢাকার চারুকলা চত্বরের আধুনিক মঙ্গল শোভাযাত্রা পর্যন্ত— প্রতিটি বাঁকে পহেলা বৈশাখ প্রমাণ করেছে যে এটি সময়ের সাথে সাথে নিজেকে নবায়ন করতে সক্ষম। গ্রামীণ মেলার সেই মাটির সরা থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের যুগে বৈশাখী শুভেচ্ছা বিনিময়— মাধ্যম বদলালেও মূলে রয়ে গেছে সেই আদি বাঙালির নাড়ির টান। বিশ্বায়নের এই যুগে লোকজ ঐতিহ্যগুলো যখন হুমকির মুখে, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা। বাঙালির রাজনৈতিক স্বাধিকারের যে প্রেরণা ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালে কাজ করেছিল, তার সাংস্কৃতিক রসদ যুগিয়েছে এই পহেলা বৈশাখ। এটি কেবল উৎসব নয়, এটি বাঙালির বেঁচে থাকার অঙ্গীকার। এই উৎসব টিকে থাকার মানেই হলো একটি অসাম্প্রদায়িক, উদার ও আধুনিক বাঙালি জাতিসত্তার টিকে থাকা। পহেলা বৈশাখ তার অশুভ বিনাশী শক্তির মাধ্যমে আমাদের নতুন বছরের নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করুক— এই হোক আমাদের আগামী দিনের প্রত্যাশা।

লেখক: মুহাম্মদ রিয়াদুল ইসলাম আল-মাহদী, গবেষক, প্রিজম রিসার্চ সেন্টার

Post a Comment

0 Comments