সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী: একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহামানব ও তাঁর জীবনদর্শন

 সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (১৯৪৯-২০২০), যিনি তার ভক্তদের কাছে 'সূফী সম্রাট' হিসেবে পরিচিত, বাংলাদেশের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার অনুসারীরা তাকে 'একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহামানব' এবং 'ইমামুয যামান' (যুগের ইমাম) হিসেবে অভিহিত করেন। তার জীবনদর্শন ও কার্যক্রমের একটি বিস্তারিত গবেষণামূলক পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:

 সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.)


জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা ১৪ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানাধীন বাহাদুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতার নাম সৈয়দ আব্দুর রশিদ সরকার এবং মাতা সৈয়দা জোবেদা খাতুন । তিনি সরাসরি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর বলে তার দরবার থেকে দাবি করা হয় । শিক্ষা জীবনে তিনি তালশহার কারিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে ফাজিল ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ছাত্র থাকাকালীন মাদ্রাসা ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক জীবন

তার জীবনের একটি অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। তিনি ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে একজন প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কুরআন ও হাদীসের আলোকে দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধানের অনুরোধে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন

আধ্যাত্মিক সাধনা ও দেওয়ানবাগ শরীফ প্রতিষ্ঠা

সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন তিনি ফরিদপুরের চন্দ্রপাড়া দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা শাহ্‌ সুফি সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আসেন এবং তার কাছে মুরিদ হন । পরবর্তীতে তিনি তার মুর্শিদের কনিষ্ঠ কন্যা সৈয়দা হামিদা বেগমকে বিবাহ করেন এবং 'প্রধান খলিফা'র মর্যাদা লাভ করেন । ১৯৮৫ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগে 'বাবে জান্নাত' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধর্মপ্রচার শুরু করেন এবং 'দেওয়ানবাগী' নামে পরিচিত হন । ১৯৯২ সালে ঢাকার মতিঝিলের আরামবাগে তার প্রধান কার্যালয় 'বাবে রহমত' স্থাপিত হয়

মোহাম্মাদী ইসলামের জীবনদর্শন

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা প্রবর্তিত দর্শনের মূল ভিত্তি হলো 'মোহাম্মাদী ইসলাম', যা তার মতে ইসলামের আদি ও প্রকৃত রূপ । তার প্রবর্তিত দর্শনের প্রধান চারটি শিক্ষা হলো: ১. তাজকিয়াতুন নফ্‌স (আত্মশুদ্ধি): হৃদয়ের পশুত্ব ও কুপ্রবৃত্তি দমন করে পবিত্র চরিত্র গঠন করা । ২. জিকিরে কলবী (দিলজিন্দা): হৃদস্পন্দনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকা । ৩. নামাজে হুজুরী (একাগ্রতা): নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে আধ্যাত্মিক যোগাযোগ বা 'দিদার' লাভের চেষ্টা করা। ৪. আশেকে রাসূল (সা.): মহানবী (সা.)-এর প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা পোষণ করা

তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বর্তমান যুগেও মানুষ কঠোর সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.)-এর নূরানী দিদার বা সাক্ষাৎ লাভ করতে পারে।

কেন তাকে 'শ্রেষ্ঠ মহামানব' বলা হয়? (অনুসারীদের দৃষ্টিভঙ্গি)

তার ভক্তরা তাকে একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহামানব বলার পিছনে বেশ কিছু যুক্তি ও বাস্তবতা তুলে ধরেন:

  • ধর্মীয় সংস্কার: তিনি দাবি করতেন যে গত ১৪০০ বছরে ইসলামে অনেক বিকৃতি ঢুকেছে এবং তিনি সেই সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত ইসলাম পুনরুজ্জীবিত করেছেন

  • বৈশ্বিক প্রভাব: তার নেতৃত্বে মোহাম্মাদী ইসলাম বিশ্বের ১৩২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বর্তমানে তার ৩ কোটিরও বেশি ভক্ত রয়েছে বলে দাবি করা হয়

  • অলৌকিকতা ও আধ্যাত্মিক শক্তি: তার অনুসারীরা তার অসংখ্য কেরামত বা অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী, যেমন—তার স্পর্শে বোবার কথা বলা বা অন্ধের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া।

  • মানবসেবা: তিনি কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই দেননি, বরং অসংখ্য স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন

বিতর্ক ও বাস্তবতা

তার কিছু বক্তব্য ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা বাংলাদেশের আলেম সমাজের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আল্লাহর আকার (আল্লাহ নিরাকার নন), জান্নাত-জাহান্নামের প্রতীকী ব্যাখ্যা এবং সাহরীর সময় নিয়ে তার মতবাদগুলো ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ১৯৯১ সালে শরীয়ত বিরোধী হিসেবে ফতোয়া জারি হয় । তবে তার অনুসারীরা এসব সমালোচনাকে 'ভুল বোঝাবুঝি' হিসেবে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন যে তার দর্শন ইসলামের মূল নীতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ সালে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে ঢাকার কমলাপুরের 'বাবে মদীনা'-তে দাফন করা হয় । মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র ইমাম প্রফেসর ড. কুদরাত এ খোদার হাতে দরবারের নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করে যান।

লেখক: মুহাম্মদ রিয়াদুল ইসলাম আল-মাহদী

Post a Comment

0 Comments